ভিটামিন ডি কমে গেলে করণীয় কি?

ভিটামিন ডি কমে গেলে করণীয় কি?

বর্তমান সময়ে ভিটামিন ডি মানব স্বাস্থ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। শিশুদের দৈহিক কাঠামো বৃদ্ধি করার অন্যতম ক্যালসিয়াম- যা শরীরের ভিটামিন ডি দ্বারা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হয়। শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি, দৈহিক স্থূলতা সবকিছু ভিটামিন ডি-র সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। আধুনিক জীবনযাত্রার ধরণ আমাদের স্বাস্থ্যের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। 

আমরা অনেকেই দীর্ঘক্ষণ অফিসে বসে কাজ করি, ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটাই, এবং সূর্যের আলোর সংস্পর্শে কম আসি। এর ফলে আমাদের শরীরে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে ভিটামিন ডি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।  ভিটামিন ডি মূলত একটি স্টেরয়েড হরমোন। অন্যান্য ভিটামিন আমাদের শরীরে এন্টি অক্সিজেন বা কো-এনজাইম হিসাবে কাজ করে, কিন্তু ভিটামিন ডি (স্টেরয়েড হরমোন) মানবদেহের জিন এক্সপ্রেশন নিয়ন্ত্রণ করে অর্থাৎ দেহের প্রোটিন তৈরিতে নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকা পালন করে।

ভিটামিন ডি-এর কার্যকারিতা:

হাড়ের স্বাস্থ্য ও ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভিটামিন ডি-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা:

মানবদেহে হাড় শুধুমাত্র কাঠামোগত সমর্থন প্রদান করে না, বরং ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ভাণ্ডার হিসেবেও কাজ করে। শরীরে ভিটামিন ডি-এর পর্যাপ্ত মাত্রা থাকা হাড়ের স্বাস্থ্য ও ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অপরিহার্য।

ভিটামিন ডি কীভাবে কাজ করে?

ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে সহায়তা করে: ভিটামিন ডি অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে সহায়তা করে, যা হাড়ের গঠন ও বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

হাড়ের কোষ তৈরিতে ভূমিকা রাখে: ভিটামিন ডি অস্টিওব্লাস্ট নামক হাড় তৈরির কোষের বৃদ্ধি ও কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে।

হাড়ের খনিজ ঘনত্ব বৃদ্ধি করে: ভিটামিন ডি হাড়ের ম্যাট্রিক্সে খনিজ জমা করতে সাহায্য করে, যার ফলে হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়।

হাড়ের রিসোর্পশন নিয়ন্ত্রণ করে: ভিটামিন ডি অস্টিওক্লাস্ট নামক হাড় ভাঙার কোষের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে হাড়ের অতিরিক্ত ক্ষয় রোধ হয়।

ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির প্রভাব:

রিকেটস: শিশুদের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি রিকেটসের কারণ হতে পারে, যা হাড়ের নরমতা, দুর্বলতা, এবং বিকৃতির দিকে ধাবিত করে।

অস্টিওম্যালেসিয়া: প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি অস্টিওম্যালেসিয়ার কারণ হতে পারে, যা হাড়ের ব্যথা, দুর্বলতা, এবং ভাঙা হাড়ের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা: ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পেশী ব্যথা, দুর্বলতা, ক্লান্তি, এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসের সাথেও যুক্ত।

ভিটামিন ডি-এর উৎস:

সূর্যের আলো: সূর্যের আলো ভিটামিন ডি-এর প্রাথমিক উৎস। ত্বক সূর্যের আলোর সংস্পর্শে এলে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়।

খাবার: কিছু খাবারে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি থাকে, যেমন মাছের তেল, ডিমের কুসুম, এবং মাশরুম।

সাপ্লিমেন্ট: যদি খাদ্য থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না পাওয়া যায়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট খাওয়া যেতে পারে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ভিটামিন ডি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। 

ভিটামিন ডি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বেশ কিছুভাবে সাহায্য করে:

শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা বৃদ্ধি: ভিটামিন ডি শরীরে বিভিন্ন ধরণের শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। এই কোষগুলি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ বৃদ্ধি: ভিটামিন ডি কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে পারে এবং কিছু ধরণের ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

প্রদাহ কমিয়ে: ভিটামিন ডি প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, যা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে: ভিটামিন ডি শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করতে এবং শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির ফলে সর্দি-কাশি, ফ্লু, এবং অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

অন্যান্য কার্যকারিতা: ভিটামিন ডি কিছু গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেমন কোষ বিভাজন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণ।

আধুনিক জীবনযাত্রায় ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির কারণ:

সূর্যের আলোর সংস্পর্শে কম থাকা: আমরা অনেকেই ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটাই, অফিসে কাজ করি, এবং সূর্যের আলোর সংস্পর্শে কম আসি। সূর্যের আলো আমাদের ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরি করে।

কিছু নির্দিষ্ট রোগ: সিলিয়াক রোগ, ক্রোনের রোগের মতো কিছু রোগে ভিটামিন ডি শোষণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

মোটা হওয়া: মোটা মানুষদের শরীরে ভিটামিন ডি কম শোষিত হয়।

বয়স বৃদ্ধি: বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরির ক্ষমতা কমে যায়।

ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির লক্ষণ:

  • হাড়ের দুর্বলতা, ব্যথা
  • ক্লান্তি, দুর্বলতা
  • পেশীর ব্যথা
  • মেজাজ খারাপ, বিষণ্ণতা
  • ঘন ঘন সর্দি-কাশি
  • ঘাম হওয়া
  • দ্রুত ওজন বৃদ্ধি

ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির কারণ:

  • সূর্যের আলোর সংস্পর্শে কম থাকা
  • কিছু নির্দিষ্ট রোগ যেমন সিলিয়াক রোগ, ক্রোনের রোগ
  • কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
  • মোটা হওয়া
  • বয়স বৃদ্ধি

ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির প্রতিরোধ ও চিকিৎসা:

সূর্যের আলো থেকে (ভিটামিন ডি) গ্রহণ:

নিয়মিত সূর্যের আলোতে বের হওয়া ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি রোধ করার সবচেয়ে সহজ উপায়।

প্রতিদিন ১৫-২০ মিনিট সূর্যের আলোতে হাঁটা, দৌড়ানো, বা শরীরের উন্মুক্ত অংশ সূর্যের আলোতে রাখা যথেষ্ট। তবে, সাবধানে রোদে পোড়া এড়িয়ে চলা উচিত।

খাবার: কিছু খাবারে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি থাকে, যেমন মাছের তেল, ডিমের কুসুম, মাশরুম।

ভিটামিন ডি দ্বারা সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণে সাহায্য করতে পারে।

সাপ্লিমেন্ট: যদি আপনার খাদ্য থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না পাওয়া যায়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট খাওয়া যেতে পারে।

জীবনধারা:

নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, এবং পর্যাপ্ত ঘুমানো ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি রোধে সাহায্য করতে পারে।

ডাক্তারের পরামর্শ: আপনার যদি মনে হয় যে আপনার ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হতে পারে, তাহলে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে আপনার ভিটামিন ডি-এর মাত্রা নির্ণয় করা যাবে।

ডাক্তার আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা পরামর্শ দেবেন।

অতিরিক্ত ভিটামিন ডি এর কিছু অপকারিতা:

শরীরে অতিরিক্ত মাত্ৰাই ভিটামিন ডি থাকলে  রক্তে ক্যালসিয়াম, প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম এবং রক্তে ফসফেটের মাত্রা বেশি হয়ে যেতে পারে। সূর্যরশ্মি যেমন ভিটামিন ডি তৈরি করতে সহায়তা করে আবার  অতিরিক্ত ভিটামিন ডি ধ্বংস করতেও  ভূমিকা রাখে। 

আবার শুধুযে সূর্যরশ্মি থেকেই  মাত্রাতিরিক্ত ভিটামিন ডি শরীরে জমা হয় বিষয়টি এমনও নই। অর্থাৎ শরীরে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি জমা হইতে পারে অতিরিক্ত পরিমাণ ভিটামিন ডি খাবার গ্রহণ করার ফলে। শিশুদের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি ইনজেকশন দেয়া, কিংবা ক্যাপসুল অথবা বিভিন্ন রকম খাদ্যে ভিটামিন ডি যুক্ত করে (ভিটামিন ডি ফর্টিফায়েড) খাবার খেলে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি দেহে জমা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

যদি মানব দেহে  ভিটামিন ডি-র পরিমাণ বেড়ে যায় তাহলে যে লক্ষণগুলো দেখা দেবে তা প্রধানত রক্তে ক্যালসিয়াম বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ শারীরিক দুর্বলতা, ক্ষুধা মন্দা, বমি ভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা বমি হওয়া ইত্যাদি। এ সময় রক্তের ক্যালসিয়াম মাপলে ১৩.৪-১৮.৮ মিলিগ্রাম/ ডেসি লিটার এর মধ্যে থাকতে পারে। 

সুতরাং ভিটামিন ডি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব বহুমিক পালন করে। রক্তকণিকার কার্যকারিতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে হারের দৃঢ়তা বৃদ্ধিকরণে ভিটামিন ডি সরাসরি ভূমিকা পালন করে থাকে। ভিটামিন ডি-র ঘাটতি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে যে কোনো লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে রক্তে ভিটামিন ডি-র মাত্রা নিরূপণের উদ্যোগ নিতে হবে। আবার শরীরে ভিটামিন ডি-র পরিমাণ বেড়ে গেলেও নানান ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হইতে হবে। তাই ভিটামিন ডি এর পরিমান যেন মাত্ত্রাতিরিক্ত না হয়ে যায় সেই দিকে ও খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে ডাক্তার এর পরামর্শের শরণাপন্ন হতে হবে। 

শেয়ার করুনঃ

Related Posts

মেডিসিন বিশেষজ্ঞঃ দায়িত্ব

১. রোগের পরিচিতি ও পরীক্ষা: মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার প্রথমে রোগের পরিচিতি করে এবং রোগীর সার্বিক স্বাস্থ্য অবস্থা পরীক্ষা করে তাদের

Read More

বাংলাদেশে মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের সাফল্য

বাংলাদেশে, মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যযত্নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহৎ সাফল্য অর্জন করেছেন। যেকোনো দেশের স্বাস্থ্য যোগাযোগের প্রতি তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা

Read More